ছবিঃ সংগৃহীত
পাকিস্তানে কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের রাজনীতি ও ব্যক্তিগত জীবনে সংকট কাটছেই না। একদিকে কারাগারে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি নিয়ে চরম উদ্বেগে রয়েছে পরিবার ও দল, অন্যদিকে তার প্রধান রাজনৈতিক দুর্গ খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সরকার বাতিল করে সেখানে জরুরি অবস্থা জারি করেছে দেশটির কেন্দ্র। ৭৪ বছর বয়সি সাবেক এই ক্রিকেট তারকা ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন। গত ২০২৩ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর থেকেই তিনি কারাবন্দী। জেলে তার সঙ্গে কারও সাক্ষাৎ করার ওপরও দীর্ঘদিন কড়া নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে ইমরান খান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অস্বীকার করে আসছেন।
বর্তমানে নির্জন কারাবাসের কারণে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে বলে দাবি করছে তার পরিবার। এক চোখে দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া, রক্তচাপের তীব্র ওঠানামা এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কারণে দ্রুত তার উন্নত চিকিৎসার দাবি জানানো হচ্ছে। ২০২৩ সালে ইমরান খানের গ্রেপ্তারের পর দেশজুড়ে নজিরবিহীন দাঙ্গা দেখা দিয়েছিল। সেই ধরনের সহিংসতা এড়াতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকার পিটিআই নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল। সেখানে পিটিআই-এর মূল দাবি ছিল—ইমরান খানের জন্য ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিশ্চিত করা, কারাগারে স্বজনদের সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া এবং লন্ডনে থাকা দুই ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার অনুমতি।
তবে জুনিয়র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তালাল চৌধুরী জানান, বিনিময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল—প্রদেশে ইসলামি চরমপন্থার প্রকাশ্যে নিন্দা জানানো, হামলায় নিহত নিরাপত্তা কর্মীদের জানাজায় অংশ নেওয়া এবং সরকারের সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে যোগ দেওয়া।
তালাল চৌধুরীর দাবি, ‘পিটিআই যেসব দাবি করেছিল, তার প্রায় সবই মানতে রাজি হয়েছিল সরকার। কিন্তু তারা আমাদের শর্ত মানতে রাজি হয়নি।’
সাম্প্রতিক সময়ে আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এই উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশে সশস্ত্র জঙ্গি হামলা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ তুলে গত রবিবার জরুরি অবস্থা জারি করেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে জঙ্গি দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে জারদারির নিজের দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) এক নেতার হাতে প্রদেশের প্রশাসনিক দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়েছে। পিটিআই অবশ্য সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছে। দলটির নেতাদের অভিযোগ, অর্থনৈতিকভাবে পিটিআইকে দুর্বল করা এবং ইসলামাবাদমুখী আন্দোলন থামাতেই জরুরি অবস্থা জারির এই অজুহাত তৈরি করা হয়েছে।
ইতিমধ্যেই পেশোয়ার হাইকোর্টে সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে রিট করেছে পিটিআই। দলটির জ্যেষ্ঠ নেতা ও ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফি বুখারি বলেন, ‘ইমরান খানের মৌলিক মানবাধিকারের বিষয়টিকে সন্ত্রাসবাদের মতো একটি জটিল বিষয়ের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হাস্যকর।’
জরুরি অবস্থা ঘোষণার ঠিক আগেই ইমরান খানের মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে ‘লং মার্চ’-এর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হাজার হাজার সমর্থক। তবে আন্দোলন রুখতে কঠোর অবস্থানে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। লং মার্চ শুরুর আগেই গ্রেপ্তার করা হয় ইমরান খানের তিন বোন এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষনেতাসহ শত শত পিটিআই সমর্থককে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাজম শেঠি মনে করেন, এই ঘটনা ইমরান খানের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়। তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে পিটিআই বড় ধরনের ধাক্কা খেল। একদিকে তারা খাইবার পাখতুনখাওয়ায় প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারাল এবং নেতাদের জেলে যেতে হলো, অন্যদিকে ইমরানের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট সুবিধা আদায় করতে পারল না।’ বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের ক্ষমতাধর সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনীরের সঙ্গে ইমরান খানের চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে আরো উসকে দিল।
পাকিস্তানে ১৯৭৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত মোট পাঁচবার প্রাদেশিক জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনবারই হয়েছে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় এবং একবার করে পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তান প্রদেশে। তবে অতীত ইতিহাস বলছে, প্রতিবারই কয়েক মাসের মধ্যে আদালত বা রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
এক যৌথ বিবৃতিতে স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান’ (এইচআরসিপি) সরকারের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে। রাজপথের দমন-পীড়ন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তারা বলে, ‘পরিস্থিতি শান্ত করতে আমরা কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইকে অবিলম্বে একটি অর্থবহ রাজনৈতিক সংলাপে বসার আহ্বান জানাচ্ছি।’